আবুল কালাম আজাদ

মোখলেস। আমাদের বন্ধু মোখলেস। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমরা একসাথে লেখাপড়া করেছি।
মোখলেসের মধ্যে ঘুমানোর অসাধারণ এক শক্তি ছিল এবং আছে। ছাত্র জীবনে দেখেছি, ক্লাশে টিচার আসামাত্র মোখলেস ঘুমিয়ে যেত। স্কুলে কখনো কখনো কোনো কোনো টিচার ওর ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতেন। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ও খুব শন্তিতেই ক্লাশে ঘুমোতে পেরেছে।
ক্লাশে ঘুমানোর করণে মোখলেসের রেজাল্ট যে খারাপ হয়েছে তা নয়। সে স্টুডেন্ট হিসাবে ছিল অনেকের চেয়েই ভালো। কিন্তু কীভাবে? ক্লাশ থেকে টিচার চলে যাবার পর মোখলেসের ঘুম ভাঙতো। সে আড়মোড় ভেঙে বলতো: কোন চ্যাপ্টার হলোরে…..?
কোন টিচার কী পড়িয়েছেন আমাদের কাছ থেকে জেনে নিয়ে মোখলেস তা খাতায় টুকে রাখতো। দরকারি নোটগুলোও লিখে নিতো। আট পিরিয়ড ঘুম মানে ৩৬০ মিনিট অর্থাৎ ৬ ঘন্টা ঘুম। এই ঘুমের ফলে রাতে মোখলেসের ঘুম আসতো না। বলা যায়, সারারাতই সে লেখাপড়া করতো। রাত এগারোটার দিকেই আমাদের ঢুলুঢুলু অবস্থা। চোখে পানি দিয়ে, পেঁয়াজের রস দিয়েও কোনো ফল পেতাম না। ক্লাশে মনোযোগ দিয়ে যা শুনেছিলাম তাও ভুলে যেতাম। আমাদের বন্ধু ফরহাদ জোর করে একদিন রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে একটা মাত্র লাইনই পড়েছিল। লাইনটা হলো—অপর পাতায় দেখো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে মোখলেস ঘুমানোর আরও একটা অসাধারণ উপায় বের করলো। বিশ্ববিদ্যালয় লাইফে আমরা সবাই টুকটাক প্রেম করেছি। কিন্তু আমাদের কারোরই প্রেম বেশিদিন টিকতো না। প্রেম টেকানোর শর্ত হলো, প্রেমিকা যা বলবে বিনা বাক্যে তাতে সায় দেয়া, প্রেমিকার সাথে তর্কে না যাওয়া, প্রেমিকার সামনে অন্য কোনো মেয়ের প্রশংসা না-করা। আমরা এই শর্তগুলো ঠিক মতো পালন করতে পারতাম না। প্রেম ভেঙে গেলে আমরা বেশ কিছুদিন এলোমেলো থাকতাম, কবিতা লিখতাম, হেরে গলায় বিচ্ছেদের গান গাইতাম, একটা সিগারেট চার/পাঁচ জনে ভাগ করে খেতাম। লেখাপড়ায় মন বসাতে পারতাম না।
কিন্তু মোখলেস শর্তগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতো।

মোখলেসের প্রেমিকার নাম ছিল শিলা— আমাদের ডিপার্টমেন্টের অন্যতম সুন্দরী। সে এখন আমাদের শিলা ভাবী। যেহেতু সে এখন আমাদের ভাবী, সেহেতু বোঝাই যাচ্ছে যে, মোখলেসের প্রেম সফল হয়েছে।
মোখলেসের ডেটিং প্লেস মানেই ছিল শান্ত, নিরিবিলি কোনো জায়গা। আধা কেজি বাদাম কিনে মোখলেস শিলাকে নিয়ে নিবিরিলি জায়গায় বসতো। বাদাম ছিল শিলার সবচেয়ে প্রিয় খাবার। আমাদের মনে হতো, দেড়/দুই কেজি বাদাম শিলা এক বসায় খেয়ে উঠতে পারতো।
নিরিবিলি জায়গায় বসা মাত্র মোখলেস শিলার কাঁধে মাথা রাখতা। প্রেমিক কাঁধে মাথা রাখবে এটা যেকোনো প্রেমিকার জন্য সুখের ব্যাপার। মাথা রাখামাত্র মোখলেস ঘুমিয়ে যেত। শিলা বাদাম খেতে খেতে তার মতো কথা বলে যেত। বাধাহীন কথা বলায় মেয়েদের যত সুখ। ঘুমের মধ্যে রেসপন্স করার অদ্ভূত এক ক্ষমতা অর্জন করেছিল মোখলেস। সে দিব্যি হ্যাঁ-হু করে যেত। হ্যাঁ-হু তেই শিলা খুশি। মোখলেস যেহেতু শিলার সাথে থাকার সময়টা ঘুমিয়েই কাটাতো সেহেতু অন্য কোনো মেয়ের প্রশংসা করার প্রশ্নই আসে না। তর্কও হতো না।
ক্লাশের ঘুম, আর শিলার কাঁদে মাথা রেখে ঘুম মিলে মোখলেসের ২৪ ঘন্টার প্রয়োজনীয় ঘুম হয়ে যেত। রাতে সে শুধু পড়তো আর পড়তো। সুতরাং সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হল কৃতিত্বপূর্ণ রেজাল্ট নিয়ে।

আমরা সবাই একযোগে চাকরির বাজারে হানা দিলাম। চাকরির বাজারে সবচেয়ে মূল্যবান চাকরি হলো বিসিএস ক্যাডার হওয়া। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পূর্ব শর্ত হলো, গাইড বই মুখস্ত করতে পারা। আমরা বন্ধুরা মিলে একটা গ্রুপ করলাম। আমরা চায়ের দোকানে, কফিসোপে, লাইব্রেরিতে বসে গাইড বই চর্চা করতাম। একে অপরকে নানা প্রশ্ন ধরতাম। পরস্পরের মধ্যে আলোচনা হতো। মোখলেস এই ধরাধরি, আলোচনা কোনো কিছুতেই থাকতো না। সে চায়ের দোকানের খুটিতে হেলান দিয়ে দিব্যি ঘুমাতো। তখন ওর মুখের এক পাস দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়তো। চায়ের দোকানদার মামা বলতো, এই লোকের চাকরি হইতো না। হইলেও হবে দারোয়ানের চাকরি। সারাদিন টুলে বইসা ঘুমাইবো।
আশ্চার্যের বিষয় হলো, আমরা কোনো প্রশ্নে আটকে গেলেই মোখলেসের ঘুম ভেঙে যেত। সে একটা শোঁ শব্দ করে বাইরের লালা ভেতরে টেনে নিয়ে আমাদের প্রশ্নের সঠিক জবাব দিয়ে দিতো। দোকানদার মামা বলতো, এই লোকে সাথে জ্বিন-টিন আছে মনে হয়। তার তো এইসব প্রশ্নের উত্তর জানার কথা না।
ঘটনা একটাই, সারাদিন যত্রতত্র ঘুমিয়ে মোখলেস সারা রাত পড়তো। আমরা গল্প করতে করতে, চা-সিগারেট খেতে খেতে যা পড়তাম তার ত্রিশ ভাগও ব্রেনে আটকে রাখতে পারতাম কি না সন্দেহ। আর মোখলে নিশিথ রাতে নিস্তব্ধ ঘরে যা পড়তো তাই-ই ব্রেনে আটকে রাখতো। চায়ের দোকানে ঘুমের ঘোরে আমাদের মুখ থেকে শুনে যেটুকু শিখতো সেটা ছিল তার বাড়তি পাওনা।
সুতরাং জিতে গেল মোখলেস। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র মোখলেসই হলো বিসিএস ক্যাডার। বাংলাদেশে বিসিএস ক্যাডার কি জিনিস তা সবাই জানে। মোখলেসের ব্যাপারে শিলার বাবার একটু দ্বিমত ছিল। বলতেন, ছেলেটাকে আমার ল্যাভেন্ডিস লাগে। কিন্তু মোখলেস বিসিএস ক্যাডার হবার পর শিলার বাবার মনে আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব রইল না। শিলা হলো বিসিএস ক্যাডার নামক বিরাট এক অফিসারের বউ, সেই সাথে আমাদের ভাবী।
আমরা কেউ ছোট, কেউ মাঝারি চাকরি পেলাম। কেউ চাকরি পেল ব্যাংকে। কেউ ব্যবসা শুরু করলো। আর কেউ চলে গেল না ফেরার দেশে। না-ফেরার দেশ মানে ইউরোপ-আমেরিকার কথা বলছি। আমরা যারা দেশে আছি তাদের সাথে উপসচির মোখলেসের সাথে যোগাযোগ আছে। বড় অফিসার হয়ে সে বন্ধুদের অবহেলা করেনি বা ভুলে যায়নি। না, এই পর্যায়ে এসে তাকে মোখলেস বলা ঠিক হবে না। বলা উচিত উপসচিব মোখলেসুর রহমান।

উপসচিব হবার পরও মোখলেসুর রহমান তার যত্রতত্র ঘুমানোর পুরনো অভ্যাসটা ধরে রাখতে পেরেছে। অফিস রুমে সুযোগ বুঝে ঘুমায়। বিনা নোটিশে তার রুমে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। কলবেল বাজা মাত্র মোখলেসুর রহমান শোঁ করে তার মুখের বাইরের লালা ভেতরে টেনে নেয়। ঢক করে লালাটা গিলে ফেলে সোজা হয়ে বসে। কারও বোঝার সাধ্য নাই যে, এই লোকটা একটু আগে গভীর নিদ্রামগ্ধ ছিল। আগুন্তকের সাথে মোখলেসুর রহমান স্মার্টলি কথা বলে, ফাইলপত্র দেখে, বুঝে-শুনে সই করে। আগুন্তক বিদায় হওয়া মাত্র সে আবার ঘুমের অতলে হারিয়ে যায়। মোখলেসুর রহমানের অফিস রুমের সাথে সুসজ্জিত একটা রেস্টরুমও আছে। রেস্ট টাইমের এক ঘন্টা আগে থেকে এক ঘন্টা পর পর্যন্ত তিন ঘন্টা সে সেখানে ঘুম দেয়।

বাসায় ফিরে মোখলেসুর রহমানে শরীর একেবারে ঝরঝরে। এতটুকু ক্লান্তি নেই। ছেলেমেয়েদের পড়ায়। বউয়ের সাথে গল্প করে। টিভি দেখে। বই পড়ে। রাতে বিছানায় গিয়েও ঘুমে ঢলে পড়ে না। বউকে আদোর করে। শিলা ভাবী তার ওপর অনেক খুশি। মাঝে মাঝে বলে, আচ্ছা, তোমার ক্লান্তি লাগে না? তোমার চোখে ঘুম আসে না?
সে বলে, ছোট্ট একটা জীবনের অর্ধেকটা যদি ঘুমিয়েই কাটাই তো জীবনের থাকলোটা কী?
ছাত্র জীবন, চাকরি জীবন, সংসার জীবন সব জায়গায়ই মোখলেসুর রহমান চূড়ান্ত সফল। সফলতা শব্দটি তার সাথে পুরোপুরি মানিয়ে গেছে।
কিন্তু আমাদের আগের মতোই লেজে-গোবরে অবস্থা। আমরা যারা ছোট-মাঝারি চাকরি করি তারা অফিসে বসের চোখ রাঙানি দেখি, ধমক শুনি। ব্যাংকারদের ব্যস্ততা তো আরও বেশি। ব্যবসায়িদের কথা তো বলাই বাহুল্য। ছোট হোক, বড় হোক সব ব্যবসায়ীর অবস্থা মানেই দৌড় আর দৌড়। দাঁড়াবার সুযোগ নাই।
বাসায় ফিরে স্ত্রীকে টুকটাক সাহায্য করা, ছেলেমেয়েদের পড়ানো এসব আমরা ভাবতেই পারি না। ক্লান্ত শরীর শুধুই বিছানা খোঁজে। দু’চোখের পাতায় শুধুই নেমে আসে ঘুম। স্ত্রীর সাথে খুনসুটিটাও জমে ওঠে না। আমাদের প্রত্যেকের প্রাণপ্রিয় স্ত্রী আমাদের ওপর বিরক্ত। মাঝে মাঝে অভিমান করে।
কিন্তু আমাদের যে কিছুই করার নেই। জীবনের শুরু থেকেই যদি মোখলেসুর রহমানের মতো যখন-তখন যত্রতত্র ঘুমানোর কৌশল রপ্ত করতে পারতাম আজ আমরাও সফল হতাম। সফল হতাম ঘরে এবং বাইরে।
আজ বুঝতে পারি, যত্রতত্র ঘুমই ফলতার চাবিকাঠি।